রাজনৈতিক বিশ্লেষণ #১

আমেরিকার উটাহ ভ্যালি ইউনিভার্সিটিতে তার পরিচালিত আমেরিকান কামব্যাক ট্যুরে বক্তৃতার সময় অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন চার্লি কার্ক। কার্ক হলেন আমেরিকায় উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদী রাজনীতির পোস্টারবয় এবং স্বাভাবিকভাবেই ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ। খবরটি দাবানলের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই নেটিজেনরা মূলত কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে এবং এর বাইরে ট্রাম্প এবং অন্যান্য রিপাবলিকান নেতারা তাদের দীর্ঘ ঐতিহ্য বজায় রেখে এর মধ্যে অতিবামপন্থী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন এবং কার্ককে কার্যত জাতীয় শহীদের মর্যাদা দিয়ে দিয়েছেন।

যদিও এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই, আমেরিকায় দীর্ঘদিনের বিতর্কিত গান ল্য এর প্রসঙ্গে কার্ক সাহেব বলেছিলেন এটি আমেরিকানদের ইশ্বর প্রদত্ত অধিকার সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট রক্ষার জন্য আবশ্যক, তাই গান ভায়োলেন্স এর মত নিছকই ক্ষুদ্র কোলাটেরাল ড্যামেজকে (প্রসঙ্গত ২০২৩ সালে ৬৫৬ টি ও ২৪' এ মোট ৫০৩ টি মাস শুটিং এর ঘটনা ঘটেছে) ব্যাজার মুখে মেনে নিতে হবে।যদিও আয়রনি এখানেই শেষ হচ্ছে না, বরং এই ঘটনায় আয়রনি আক্ষরিক অর্থেই আয়রনির একাধিক স্তর উন্মোচন করেছে। কার্কের মৃত্যুর ঘটনা শুনে বাম প্রগতিশীলদের একটি বৃহৎ অংশ বলছে তারা কার্কের মৃত্যুর খবর শুনে আনন্দিত ও এই পরিণতি তার প্রাপ্য ছিল, আরেকটি অংশ বলেছে যে তার সাথে একাধিক মতবিরোধ থাকলেও তার হত্যা সমর্থনযোগ্য না, বরং এটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হিংসার আরো পথ প্রশস্ত করলো। এবারে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজ রাজনৈতিক পরিবেশে ভিন্ন মতের কোনো মানুষের হত্যাকে সেলিব্রেট করা আদতে ডানপন্থী বিদ্বেষকামী বাইনারিকেই শক্তিশালী করছে কি না সেই ব্যাপারে প্রগতিশীলদের ভেবে দেখা উচিত; ব্যাপারটা বিশদে বলা যাক।

চার্লি কার্ক মূলত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ডিবেট করতেন। অভিবাসীদের আগ্রাসনে আমেরিকার সাদা সাহেবরা নিপীড়িত ও বিপন্ন এবং ওক নামক মারণ ভাইরাস কিভাবে দেশবাসীর খ্রিস্টীয় সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছে তা নিয়ে লোকশিক্ষে দিতেন। তবে তারা লোকশিক্ষাতেই থেমে থাকেননি, তার পাশাপাশি "দেশদ্রোহী" প্রফেসর এবং শিক্ষকদের "ওয়াচলিস্ট"ও বানিয়েছিলেন যারা তাদের মতে দেশবিরোধী, বাম লিবারাল প্রপাগাণ্ডা প্রচার করে। এইরকম একটি ডিবেটেই এক ছাত্র প্রশ্ন করে একসময় ইটালিয়ান, ব্রিটিশ, জার্মান ও আইরিশরাও আমেরিকায় অভিবাসী ছিলো কি না, কার্ক কার্যত হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টদের টেক্সটবুক ঢপটা দেন যে উক্ত সেটেলাররা এই দেশে এসে নিজের পরিশ্রমে দেশ গড়ে তুলেছে, কিন্ত বর্তমান অভিবাসীদের ন্যায় অন্যদের পয়সায় নিজেদের জীবনবৃত্তি চরিতার্থ করেনি; মূলত এইসব ডিবেটের মাধ্যমে বাম লিবারাল প্রভাবিত ক্যাম্পাসে ডানপন্থী কাউন্টার হেজিমনি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, প্যাস্টরদের বর্ণবাদী সংগঠনের ছাতার তলায় আনা ও বিকল্প শেতাঙ্গবাদী পোষ্ট ট্রুথ শিক্ষাব্যবস্থা নির্মাণের পেছনে আর্থিক-রাজনৈতিক এবং তাত্বিক উভয় ভিত্তিই বেশ শক্তিশালী। একটি অন্যতম উদাহরন হিসেবে বলা যেতে পারে আমেরিকান বিজনেস ম্যাগনেট ও রিপাবলিকান পার্টির বিনিয়োগকারী ফস্টার ফ্রাইস সাহেব কার্কের সংগঠন টার্নিং পয়েন্ট ইউএসএ (যা কথিত নিপিড়িত সংখ্যাগুরু সাদাদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে সোচ্চার) তে বিপুল পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, এর পাশাপশি কার্ক কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল পলিসিরও সদস্য। (এখানে উল্লেখ করা উচিত চার্লি কার্কও ইলেক্টোরাল ফ্রড ও কোভিড ১৯ নিয়ে ধারাবাহিক মিসইনফরমেশন ও ফেক নিউজ প্রচার করে এবং ১৯৬৭ এর সিভিল রাইট এক্ট এর পেছনে জননায়ক মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে নিয়ে কুৎসা করে ট্রাম্প ও রিপাবলিক পার্টির প্রতিদান ফিরিয়ে দিয়েছেন।) আমেরিকায় যারা উগ্র শেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী Ethno state এর স্বপ্ন দেখে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক শিক্ষাগুরু হলো গ্রেগ জনসন, যে সরাসরি সহিংস আন্দোলনকে প্রত্যাখ্যান করে মেটাপলিটিকস এর কথা বলেছিল, সে আবার এই ধারণা আমদানি করে ৬৮' এর বাম ছাত্র আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় গড়ে ওঠা ডানপন্থী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ন্যুভেল ড্রোয়া বা ফরাসি নিউ রাইট বুদ্ধিজীবি অ্যালেইন ডি বেনোয়ার থেকে। এই রাজনীতির মূল লক্ষ্য হলো কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া ও এন্টারটেনমেন্ট এর সাংস্কৃতিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত বাম প্রগতিশীল আধিপত্যবাদী চিন্তাধারার বিকল্প হিসেবে ডানপন্থী আধিপত্যবাদী চিন্তাধারার পরিসর গড়ে তোলা এবং আস্তে আস্তে ডানপন্থী আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে চলা। এদের মতে শ্বেতাঙ্গদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে গেলে সমাজে তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। 

মূলত সেই লক্ষ্যেই মিটিং, মিছিল, বক্তৃতা, তর্কসভা এবং ভার্চুয়াল ক্যাম্পেনিং এর মাধ্যমে এই সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালিত হয়,এবং একটু লক্ষ্য করলেই সারা পৃথিবী জুড়ে এক আশ্চর্য প্যাটার্ন দেখতে পাওয়া যাবে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি, ইজরায়েলের জায়নবাদী রাজনীতি, প্যান ইসলামিক ডানপন্থী রাজনীতি (যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলিতে ক্রিয়াশীল), শেতাঙ্গ &খ্রিস্টীয় আধিপত্যবাদী রাজনীতি (যা মূলত আমেরিকা, কানাডা,ইউরোপে ক্রিয়াশীল) আপাতদৃষ্টিতে একে অপরের প্রতি বিদ্বেষকামী ও শত্রুমনোভাবাপন্ন হলেও আদর্শগত দিক থেকে তাদের মধ্যে প্রভূত মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, এবং মূলত সেই প্রেক্ষিতে দেখা গেছে উক্ত রাজনীতিতে বিশ্বাসী লোকজন ক্ষেত্রবিশেষে একে অপরের প্রতি সলিডারিটি জানিয়েছে, তারা মনে করছে আমাদের মতামত আলাদা হলেও এরাও নিজের জায়গা থেকে সৎ, নিজের জাতির/ধর্মের/ঐতিহ্যের হয়ে লড়ছে। মূলত "বিদ্বেষ" নামক মহামানবের সাগরতীরে এদের সবার মিলন ঘটেছে। (এই গ্লোবাল ট্রেন্ড এর তাত্বিক ভিত্তি, উদাহরন ও প্রসার নিয়ে পরের পর্বে আলোচনা করা যেতে পারে।)
১. নারীবাদ বিরোধিতা
২. সমকাম বিরোধিতা 
৩. সংখ্যালঘু বিদ্বেষ 
৪. উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বিরোধিতা 
৫. জাতিভিত্তিক ও ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ (exclusionary)
৬. বামপন্থার বিরোধিতা
৭. বিকল্প ইতিহাস নির্মাণ (Fake news& propaganda) 
৮. একমুখী essentialist জাতি/ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ধারার নির্মাণ।
৯. অভিবাসন বিরোধিতা ও বহুসংস্কৃতির বিরোধিতা
১০. ভিন্নমতের বিমানবীকরণ (Dehumanisation)

মুলত এই ১০ টি পয়েন্টে উক্ত উগ্র রক্ষণশীল শক্তিদের মধ্যে কমন গ্রাউন্ড লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এবং এখান থেকে যে ব্যাপারটি স্পষ্টতই বোঝা যায় তা হলো এই রাজনীতির মূল চালিকাশক্তিই হলো আমরা-ওরা বিভাজন। এই বন্ধু শত্রু বিভাজনের তাত্বিক ভিত্তি স্থাপন করেন কুখ্যাত নাৎসি আইনজ্ঞ ও তাত্বিক কার্ল স্মিট। তাঁর মতে রাজনীতির মূল সারবস্তু নৈতিকতা না, বরং এই আমরা-ওরা এর বাইনারি নির্মাণ। অর্থাৎ, কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অস্তিত্বই নির্ভর করছে তার ভিন্ন মতের অপর কোনো গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে "শত্রু" নির্ধারণ করে তার বিরুদ্ধে ঘৃণার রাজনীতি চালিয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনে তাকে ধ্বংস করতে উদ্যত হওয়া। মনে রাখতে হবে স্মিট এখানে সমষ্টিগত শত্রুর কথা বলছেন যাদের অস্তিত্ব উক্ত গোষ্ঠীর নিজেদের অস্তিত্বের পরিপন্থি বলে ধরে নেওয়া হয়।

বিগত কয়েক বছরে ভার্চুয়াল পরিসরে বিশ্বজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো অল্ট রাইট আসলে এই স্মিট প্রভাবিত নিও নাৎসি বাহিনী, যারা মিম, স্যাটায়ার, ডগ হুইসল, ট্রোলিং জাতীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে; এদের রাজনীতি স্বাভাবিকভাবেই নারীবাদী, সমকামী, ওক, বামপন্থী, দেশদ্রোহী, বিধর্মী ইত্যাদি গোষ্ঠীকে শত্রু নির্মাণ করে এবং ঘৃণার রাজনীতির মাধ্যমে তাদের বিমানবীকরণ ঘটিয়ে জনপরিসরে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস করতে চায়। 

আর এখানেই তথাকথিত প্রগতিশীল, "ওক" রাজনৈতিক অবস্থানের একটি ফ্যাকশনের সমস্যজনক দিকটি দেখতে পাওয়া যায়। ভার্চুয়াল পরিসরে কার্কের হত্যায় সেলিব্রেট করার অর্থ উক্ত লোকজন গণতান্ত্রিক পরিবেশে রাজনৈতিক হিংসাকে সরাসরি বৈধতা দিচ্ছেন,এবং কার্কের র‍ ্যাডিকাল ডানপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিতকরণ, স্মিটের বাইনারি রাজনীতিকেই শক্তিশালী করে তুলবে (এখানে মনে রাখতে হবে, একাধিক নারীবিদ্বেষী, বর্ণবাদী, হিংসাশ্রয়ী মন্তব্য করার পরেও কার্ক গণতান্ত্রিক মডেলে থেকে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালাতেন), ফলত কার্কের মেটাপলিটিক্সকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় থেকে কাউন্টার করার যে বিপুল পরিসর ছিল, তা আদতে সংকুচিত হতে পারে, এবং এই ঘটনাকে পুঁজি করে ডানপন্থী মহল থেকে গণতান্ত্রিক পরিসরের অকার্যকারিতার ন্যারেটিভ তুলে ধরে ভবিষ্যতের আরো অনেক চার্লি কার্ককে র‍্যাডিকালাইজ করা হবে। 

(শেষ প্যারা নিয়ে আরো অনেক বিশদে আলোচনা করার আছে, এখানে মূলত একটি সামারি দেওয়া হলো।)


Popular posts from this blog

Lichess 100000+ Mate in two&Mate in three examples.

আঁধার আর মোমবাতি অথবা লোডশেডিং এর কবিতা।

A Technical Guideline for Chessbase 18 (Part 1)